গৌরনদী
প্রবাসীর চেয়ে ভয়ংকর নারায়নগঞ্জ থেকে ফেরা লোকজন, গ্রামকে ঝুঁকিতে ফেলছে
জহুরুল ইসলাম জহিরঃ বৈশ্বিক মহামারি করোনা আতঙ্ক দেখা দেওয়ার পরে প্রবাসীরা দেশে ফিরে আসতে শুরু করলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে। সরকার প্রবাসীদের হোম কোয়ারেন্টি থাকতে নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্দেশ তেমনটি কার্যকর হয়নি অর্থাৎ আমরা প্রবাসীরা তা গুরুত্ব দেইনি। ফলে সারা দেশে করোনা ছড়িয়ে পরে । বর্তমানে নারায়নগঞ্জে করোনা ভয়াবহ রুপ ধারন করেছে। এ অবস্থায় সকলকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু তা না করে আমরা প্রান ভয়ে একের পর এক দলবেধে অবৈধ পথে নারায়নগঞ্জ ছেড়ে গ্রামের বাড়ি পাড়ি জমাচ্ছি। আর করোনাকে ছড়িয়ে দিচ্ছি গ্রাম থেকে গ্রামে। আমি নারায়নগঞ্জ ছাড়ার আগে একবারও কি ভেবে দেখেছি আমি দেশের ও আমার স্বজনদের কতটা ক্ষতি করছি? হাদীসে আসছে নবী করিম (সঃ) এরশাদ করেন, যদি কোথায় মহামারি দেখা দেয় তাহলে সেখানেই থাকি অর্থাৎ ওই স্থান যেন স্থান ত্যাগ না করি। এবং অন্য স্থান থেকে কেউ যেন না আসি। তাহলে কেন নিজেকে রক্ষার চেষ্টায় মহামারি আক্রান্ত এলাকা ত্যাগ করে পালিয়ে আসছি? পালিয়ে এসে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা কি আল্লাহর ওপর বিশ্বাস হারানো নয়? তাই আসুন করোনা মহামারিতে আমরা অল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখে যেখানে আছি সেখানেই অবস্থান করি। আমার দায়িত্বশীল আচরই নতুন এলাকাকে আক্রান্তের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই আসুন আমরা স্ব স্ব অবস্থানে থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, আল্লাহ করোনা মহামারি করোনা থেকে আমাদের দেশবাসিকে হেফাজাত করুন। আমার এই লেখাটার কারন কারন হল, প্রতিদিন গৌরনদী, আগৈলঝাড়া ও উজিরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আমাকে ফোন করে বলেন, ভাই করোনার উপসর্গ নিয়ে নারায়নগঞ্জ থেকে লোক এসেছে। বিষয়টি একটু লিখুন এবং প্রশাসনকে জানান। আমরা আতঙ্কে আছি। কোথাও কোথাও ফিরে আসা লোকজনের সঙ্গে স্বজনরা অসৌজন্যমূলক আচরনও করছেন। এমন কি ঘর থেকে বের করে দিচ্ছেন। এ ধরনের আচরন অপ্রত্যাশিত। যখন এসেই পরেছে তখন প্রবাসী হোক আর নারায়নগঞ্জবাসীই হোকে তাদের সঙ্গে এ ধরনের অমানবিক অচরন করা থেকে বিরত থাকি। বরং এসে পরা প্রবাসী ও নারায়নগঞ্জবাসিকে হোম কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করি। অতীসম্প্রতি সময়ে নায়রায়নগঞ্জ থেকে ফিরে গ্রামে আসা কিছু আতঙ্কিত চিত্র তুলে ধরছি।
বরিশালের গৌরনদী, আগৈলঝাড়া ও উজিরপুর উপজেলায় সর্দি, জ্বর ও কাশিসহ করোনা উপসর্গ নিয়ে গ্রামে ফিরে আসা লোকজনই গ্রামে গ্রামে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ঝুঁকিতে ফেলছে স্বজনসহ গ্রামের মানুষকে। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে গ্রামবাসিসহ স্বজনরা। গত এক সপ্তাহে ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ থেকে উপসর্গ নিয়ে বরিশালে তিন উপজেলায় গ্রামে পালিয়ে এসেছে প্রায় শতাধিক ব্যক্তি।সর্দি জ্বর কাসিতে গৌরনদীতে মারা গেছে দুই নারীসহ ৩ জন ও আগৈলঝাড়ায় মারা গেছে এক যুবক ও এক নারী। এর মধ্যে স্বর্দি জ্বর কাশি নিয়ে ঢাকা থেকে আসা মারা গেছে ২ জন। তিন উপজেলায় পরীক্ষার জন্য ১৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আইসোলেশনে রাখা হয়েছে দুই জনকে। গৌরনদী, আগৈলঝাড়া ও উজিরপুর উপজেলায় লকডাউন করা হয়েছে এক শত ৩৯টি পরিবারকে।
স্থানীয় লোকজন, স্বজন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সর কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা প্রতিরোধে সরকার সারা দেশে সাধারন ছুটি ছুটি ঘোষনা করে স্ব স্ব বাড়িতে অবস্থান করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ উপেক্ষা করে প্রতিনিয়ত গ্রামের বাড়ি ফিরছে শত শত মানুষ। দুরপাল্লার বাস ও নৌ পথে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকার পরেও এসব ব্যক্তিরা কয়েক শতভাগ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে নৌপথে ট্রালারযোগে গ্রামের বাড়িতে ফিরছেন। এতে বরিশালের তিন উপজেলার সহস্রাধিক পরিবার মারাত্মক করোনা ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে গ্রামবাসি ও ভূক্তভোগী স্বজনরা জানান। তারা আতঙ্কিত হয়ে পরেছে । কেউ কেউ স্বজন হওয়া সত্বেও বাড়িতে ঘরে তুলছেন না আগত স্বজনকে।
আগৈলঝাড়া উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের পাকুরিতা গ্রামে গত বৃহস্পতিবার সর্দি, জ্বর কাশি নিয়ে বাড়িতে অসেন এক যুবক। বাড়িতে আসার পরে বাবার ঘরে উঠতে গেলে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে যুবকের বাবা ঘর থেকে বের করে দেন। বহু অনুনয় বিনয় করার পরেও বাবা মায়ের মন গলেনি। করোনা আতঙ্কের ভয়ে যুবককে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন বাবা । পরবর্তিতে ওইদিন রাতে ওই যুবক একই উপজেলার গৈলা ইউনিয়নে শ্বশুর বাড়ি গেলে শ্বশুর বাড়ির লোকজন যুবককে বাড়িতে একটি আলাদা ঘরে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে দেন। যুবকের বাবা বলেন, করোনা সংক্রমনের আশঙ্কায় ও ঝুঁকি এড়াতে ছেরেকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হয়নি। হোম কোয়ারেন্টি থেকে চিকিৎসকের কাছ থেকে করোনামুক্ত সনদ নিয়ে আসলেই তাকে বাড়িতে থাকতে দেয়া হবে। আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের পূর্ব বাগধা গ্রামে গত ৭ এপ্রিল সর্দি জ্বর কাশিসহ করোনা উপসর্গ নিয়ে ঢাকা থেকে বাড়িতে আসেন যুবক (৩৮)। এতে এলাকাবাসির মধ্যে করোনা আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে। পরের দিন বিকেল তিনটায় নিজ বাড়িতে ওই যুবক মারা যান। আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ বখতিয়ার আল মামুন ঘটনাস্থলে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকা পাঠান। আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চৌধুরী রওশন ইসলাম জানান, এলাকার নিরাপত্তার জন্য ওই গ্রামের ১৬টি বাড়ির ৬০টি পরিবারকে লকডাউন ঘোষনা করেন।
গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া ইউনিয়নের উত্তর বিল্লাগ্রাম গ্রামে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সর্দি জ্বর ও শ্বাসকষ্টে নিজ বাড়িতে মারা যান এক যুবক (৪২)। মারা যাওয়ার পরে করেনা আতঙ্কে বাড়ির লোকজন লাশ ফেলে অন্যত্র চলে যায়। গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাইয়্যেদ মোহাম্মদ আমরুল্লাহ বলেন, আতঙ্কে স্বজনরা লাশ ফেলে পালিয়ে গেলে স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রশাসনের লোকজন নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পর গ্রামের ৬০টি পরিবারকে লকডাউন করা হয়েছে। গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের চরসরিকল গ্রামে সর্দি জ্বর কাশি নিয়ে গত শুক্রবার গ্রামে আসে এক যুবক (৪০)। ওই যুবক বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির লোকজন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান।পরে প্রশাসন বাড়িটি লকডাউন ঘোষনা করেন। সরিকল ইউনিয়ন আওয়ামলীগের সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা মেজবা উদ্দিন আকন বলেন, করেনার উপনসর্গ নিয়ে যুবক বাড়িতে আসলে বাড়ির ৪টি পরিবার বাড়ি ছেলে পালিয়ে যায়। ওই যুবকের কারনে আমরা গ্রামবাসি করোনা আতঙ্ক ও ঝুঁকিতে রয়েছি। একই দিন আশোকাঠী গ্রাম আসেন ৩২ বছরের এক যুবক এতে এলাকার মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পরে।আশোকাঠী গ্রামের নুরুল ইসলামসহ কয়েকজন বলেন, নারায়নগঞ্জ মহামারি এলাকা ঘোষনা করা হয়েছে। এর পরেও এসব লোকজন গ্রামে এসে গ্রামকে সংক্রমনের ঝুকিতে ফেলছে। বাটাজের গ্রামে শনিবার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে নারাযনগঞ্জ থেকে বাড়িতে তিনটি পরিবার। এলাকা থেকে ফোন দিয়ে অনকেই জানান, ওই তিন পরিবারের মধ্যে করোনা উপসর্গ নিয়ে এসেছে একাধিক ব্যক্তি।একজন জনপ্রতিনিধি আমাকে বলেন, ভাই আমাদের গ্রামটি এখন সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষয়টি একটু পুলিশকে জানান।
উজিরপুর পৌসভার ৯নং ওয়ার্ডের পরমানন্দশাহ মহল্লায় বৃহস্পতিবার রাতে নারায়নগঞ্জ থেকে ট্রালরযোগে বাড়িতে আসেন ৬ যুবক। এতে গোটা এলাকা আতঙ্কিত হয়ে পরে। বিষয়টি স্থানীয় প্রশানকে অবহিত করার পরে ওই মহল্লার ৬টি পরিবারকে লকডাউন করা হয়। একই দিন উপজেলার বরাকোঠা ইউনিয়নের বরাকোঠা গ্রামে নারায়নগঞ্জ থেকে বাড়িতে আসেন এক যুবক। নারায়নগঞ্জ থেকে যুবক বাড়িতে ফিরে আসায় গোটা গ্রাম আতঙ্কিত হয়ে পরে। খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন ওই বাড়ির ২টি পরিবারকে লকডাউন করেন। বৃহস্পতিবার উজিরপুর উপজেলার হারতা ইউনিয়নের কালবিলা গ্রামের ৩২ বছরের এক যুবতি উপসর্গ নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভতি হয়। তাকে আইসোলেশনে রেখে নুমনা সংগ্রহ করে শুক্রবার পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ শওকত আলী শনিবার বলেন, গ্রামে ফিরে আসায় গ্রামবাসি ও স্বজনরা অসহিষ্ণ ও উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। উপজেলার হারতা ইউনিয়নে কালবিলা গ্রামে একাধিক বাড়ি ভাঙচুর করেছে এলাকাবাসি। ওই এলাকার তিন জনের নমুমা সংগহ করে শনিবার পরীক্ষার জন্য পাঠানো এবং আইসোলেমনে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, বর্তমান সময়ে শহর থেকে ব্যক্তিরা গ্রামকে সবচেয়ে বেশী সংক্রমন ঝুঁকিতে ফেলছে। আগৈলঝাড়ায় বিভিন্ন এলাকায় ঢাকা থেকে আসা ব্যক্তিদের প্রত্যাক্ষান করেছে পরিবার ও স্বজনরা এটা একটি ইতিবাচক দিক। এই মুহুর্তে গ্রামে সংক্রমন ঠেকাতে এদের হোমকোয়ারেন্টিনে রাখা জরুরী হচ্ছে। গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান বলেন, প্রবাসীর চেয়েও ভয়ংকর হচ্ছে শহর থেকে গ্রামে আসা ব্যক্তিরা। অভিবাসন ঠেকাতে বিভিন্ন আইন শৃংখলা বাহীনির সদস্যরা কঠোর অবস্থানে থেকে কাজ করছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের নমুনা সংগ্রহ ও লকডাউন করা হচ্ছে। এদেরকে পারিবারিকভাবে হোম কোয়ারেন্টিনে রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গ্রামে আসা ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্যে দিয়ে প্রশাসনকে সহায়তার জন্য তিনি গ্রামবাসির প্রতি আহবান জানান।
আমরা যারা নারায়নগঞ্জ থেকে গ্রামে আসছি তারা তো কারো না কারো ভাই, বোন আত্মীয় স্বজন। তাহলে কেন আমি গ্রামে গিয়ে গ্রামকে ঝুঁকিতে ফেলছি। আবার আসার পরে কেন ই বা স্বজনদের সঙ্গে আমি অসৌজন্যমূলক আচরন করছি। এক্ষেত্রে আমাদের সকলকেই দায়িত্বশীল আচরন করতে হবে। মানতে হবে সরকারি নির্দেশনা। ধৈর্যে্যর সঙ্গে বৈশ্বিক মহামারি করোনা মোকাবেলা করতে হবে। আল্লাহর কাছে পনাহ চাইতে হবে। বেশী বেশী তওবা ইসতাকফার করতে হবে। হে আল্লাহ আমাদের করোনার হাত রক্ষা করুন। আমিন লেখকঃ জহুরুল ইসলাম জহির, সিনিয়র সাংবাদিক, প্রতিনিধি, দৈনিক প্রথম আলো। ১২/৪/২০২০ইং


