গৌরনদী
ফাঁসির রায় ঘোষনার পরে ৮ বছর পলাতক থাকা আসামিকে গ্রেপ্তার করলেন কাউনিয়া থানার ওসি তদন্ত সগীর হোসেন
নিজস্ব প্রতিবেদক, রায় ঘোষনার আট বছর পর গ্রেপ্তার হয়েছে সদর উপজেলার চরবাড়িয়া গ্রামের আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর সুলতান বাদশা হত্যা মামলার ফাঁসির দন্ডিত আসামী। গত রোববার আসামী আনোয়ার হোসেনকে (৪২) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সে লামচরি এলাকার মৃত আব্দুল কাদের খানের ছেলে। দীর্ঘ আট বছর পলাতক দন্ডিত ঠান্ডা মাথার খুনী আনোয়ারকে গ্রেপ্তার করেছে মহানগরীর কাউনিয়া থানা পুলিশের একটি দল।
অভিযোগ রয়েছে, এ হত্যা মামলার মুল পরিকল্পনাকারী ফাঁসির দন্ডিত অপর আসামী বশির ফকিরসহ আনোয়ার একাধিক হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ছিলো। নিজ গ্রাম লামছড়ি এলাকায় তারা ঠান্ডা মাথার পেশাদার খুনী হিসেবে পরিচিত।তারা নগরীর ফড়িয়াপট্টি রোডের এক চাল ব্যবসায়ী হত্যা ও লাশ গুম করার মামলারও আসামী। এছাড়াও তাদের হাতে আরো অন্তত দুইজন নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছে। তাদের লাশ আজও পরিবার খুজে পায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে লামছড়ি গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, ঠান্ডা মাথার পেশাদার খুনী বশিরসহ তাদের অপর সহযোগি ফাঁসির দন্ডিত একই গ্রামের ইউনুসও অধরা রয়েছেন। তারা যদি ধরা না পড়ে, তাহলে তাদের মতো ঠান্ডা মাথার পেশাদার খুনীদের হাতে আরো অনেকে নির্মম হত্যার শিকার হবে। গ্রেপ্তার হওয়া আনোয়ারের ফাঁসির রায় দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যক্ররের দাবী উঠেছে খোঁদ লামছরি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে। এমনকি সুলতান বাদশার বৃদ্ধ পিতা মো. আব্দুল মালেক মাঝি সন্তান হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখে যেতে চান।
কাউনিয়া থানার ওসি আব্দুর রহমান মুকুল জানিয়েছেন, মামলার রায় ঘোষনার পূর্ব থেকে পলাতক ছিলো ফাঁসির দন্ডিত আসামী আনোয়ার। পরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করতো। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়। ধারাবাহিকতায় গোপনে জানতে পারেন আনোয়ার গাজীপুরের আশুলিয়া এলাকায় অবস্থান করছে আনোয়ার। সেই তথ্যের ভিত্তিতে আশুলিয়ার মোল্লা মার্কেট এলাকায় রোববার অভিযান করে আনোয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অভিযানে অংশ নেয়া কাউনিয়া থানার এএসআই সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, আনোয়ার ছদ্মনামে আশুলিয়া এলাকায় কাঠের বার্নিশ মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতো। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ফার্নিচারের দোকানে অভিযান করা হয়। সেখানে গিয়ে তাকে আটক করা হয়। এ সময় সে নিজেকে শরিফুল পরিচয়। এমনকি এ নামে সে মোবাইল ফোন সিম উত্তোলন করে ব্যবহার করতো। কোনভাবেই সে নিজের পরিচয় ও খুনের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেনি। প্রায় দেড় ঘন্টার চেষ্টায় তার কাছ থেকে কোন তথ্য আদায় করা যায়নি। এক পর্যায়ে একই এলাকায় তার ভাগ্নের অবস্থানের কথা জানতে পেরে তার কাছে নেয়া হয়। ওই ভাগ্নে আনোয়ারের পরিচয় নিশ্চিত করাসহ সে খুনের মামলার ফাঁসির দন্ডিত আসামী হিসেবে স্বীকার করে। তখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এএসআই সাইফুল আরো জানিয়েছেন, তাকে গ্রেপ্তারের জন্য গত এক বছর ধরে চেষ্টা করে সফল হয়েছেন। আনোয়ারসহ তাদের প্রধান সহযোগি বশিরের বিরুদ্ধে আরো যে কয়টি হত্যা মামলা রয়েছে সেই তথ্য আদালতে দেয়া হয়েছে।
আদালত সুত্রে জানা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নের লামছড়ি গ্রামের বাসিন্দা সুলতান বাদশা নগরীর পলাশপুরে বাস করতেন। ২০১০ সালের ২ জুন তাকে প্রতিবেশী বশিরউদ্দিন ফকির ও আনোয়ার পাওনা টাকা পরিশোধ করার কথা বলে মোবাইল ফোনে ডেকে নগরীর পোর্ট রোডে আবাসিক হোটেল স্বাগতমে নেয়। সেখানে ভাতের সঙ্গে চেতনানাশক দ্রব্য খাইয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় তাকে। পরে তার লাশ বস্তাবন্দি করে স্পিডবোটে কীর্তনখোলা নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এদিকে ৩ জুন সুলতান বাদশার বাবা আবদুল মালেক মাঝি আনোয়ার হোসেন, বাবু ও বশিরউদ্দিনকে আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করে। ৫ জুন কীর্তনখোলা নদীর নতুনচর গুচ্ছগ্রাম এলাকা থেকে পা বাঁধা এবং বুক ও পেট ফাড়া অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের পর অপহরণ মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর হয়। পুলিশের কাছে হত্যার ঘটনা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় আনোয়ার হোসেন ও স্পিডবোট চালক জাফর এবং মূল পরিকল্পনাকারী বশিরউদ্দিন। ২০১১ সালের ৩০ জুন এজাহারের উল্লিখিত আসামি ছাড়াও ইউনুস, আদম আলী মাঝি ও আলতাফ হোসেন খলিফাকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করেন কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই আবু সাঈদ। ৩৪ জনের মধ্যে ২২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে বিচারক ওই ৩ জনকে ফাঁসি এবং বাকি ৩ জনকে খালাস দেন। ফাসির দন্ডিতরা হলো-লামছড়ি গ্রামের মানিক ফকিরের ছেলে বশিরউদ্দিন (৩২), মৃত আবদুল কাদেরের ছেলে আনোয়ার হোসেন (৩০) ও ছত্তার হাওলাদারের ছেলে মোঃ ইউনুস (৩২)। খালাসপ্রাপ্তরা হল- লামছড়ি এলাকার আদম আলী মাঝি, বাবুগঞ্জ উপজেলার ছয় মাইল এলাকার বাবু এবং বাকেরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর এলাকার আলতাফ হোসেন খলিফা।


